মঞ্চ নাটকের নিবেদিত প্রাণ মোস্তফা কামাল যাত্রা

মোহাম্মদ আলী

মোস্তফা কামাল। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি ‘যাত্রা’ নামেই পরিচিত। বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে ১৯৮৮ সাল থেকেই গ্রæপ থিয়েটার চর্চার সাথে যুক্ত আছেন। তিন দশকের নাট্য চর্চার অভিজ্ঞতায় দেশজ কৃষ্টি ও সংস্কৃতি-নির্ভর নাট্য আঙ্গিক বিনির্মাণে নিরবচ্ছিন্নভাবে নাট্য চর্চা করে যাচ্ছেন তিনি। সমমনা নাট্য বন্ধুদের নিয়ে ২০০৫ সালে গঠন করেন গ্রæপ থিয়েটার সংগঠন ‘নাট্যাধার’।
১৯৮৮ সালে মঞ্চ মুকুট নাট্য সম্প্রাদয়ে যোগ দেন কামাল। রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী রচিত ও নির্দেশিত ‘চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তার অভিনয় জীবনের সূচনা হয়। ১৯৯৫ সালে মঞ্চমুকুট ত্যাগ করেন যাত্রা। ১৯৯৬ সালের শুরুতে কাজ শুরু করেন ‘থিয়াট্রন রেপারেটরী’ নামের পেশাদারী সংগঠনে। এ বছরই প্রতিষ্ঠা করেন ‘থিয়েটার পাঠশালা’।
১৯৯৬ সালে শহীদ নগর থিয়েটারের প্রযোজনা প্রদীপ দেওয়ানজী রচিত ‘দাবি’ নাটকটি সভা নাট্য আঙ্গিকে উপস্থাপনের মাধ্যমে নাট্য নির্দেশনার হাতেখড়ি। এ বছরের শেষ দিকে সমিকরণ থিয়েটারে যোগ দেন তিনি। সমিকরণ থিয়েটারে ‘মৃচ্ছ কটিক’ নাটকটির নির্দেশনা দেন।
তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে ‘ইউনিট থিয়েটার কনসেপ্ট’ এর নাট্যযজ্ঞ সম্পাদনকারী উন্নয়ন সংস্থা ‘উৎস (ইউনাইট থিয়েটার ফর সোশ্যাল অ্যাকশন)’ এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যুক্ত আছেন।
২০০৬ সালের ৩০ অক্টোবর জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের মিলনায়তনে আনন জামান রচিত ‘শিখন্ডী কথা’ নাটকের নির্দেশনার মধ্য দিয়ে গ্রæপ থিয়েটারের নতুন দল নাট্যাধারের সাথে নাট্য চর্চা শুরু করে অদ্যাবদি এ দলের সাথে যুক্ত আছেন কামাল। নির্দেশনা দিয়েছেন স্মৃতি ৭১, উন্মাদ সাক্ষাৎকার, বীরাঙ্গনা সাক্ষাৎকার, ফুলজান, ভগা কাইন, কবিয়াল রমেশ শীলসহ অনেক মঞ্চ নাটক। সহকারি নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন মলকা বানু, মেঘ, রক্তকরবী নাটকে।
প্রধানত নাট্য উপস্থাপনায় দেশীয় আঙ্গিক প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি ঐতিহ্যবাহী ও লোক নাট্য ভাবনার উন্মেষ ঘটাচ্ছেন প্রতিনিয়ত, যা আমাদের জাতীয় নাট্য চরিত্র নির্ধারণে সহায়ক ভ‚মিক রাখবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। দেশজ নাট্য ঐতিহ্য অনুসন্ধানে তার সর্বশেষ অনুসন্ধান হচ্ছে ‘নির্বান নাট্য’। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যা গীতিকা অবলম্বনে এই নাট্য ভাবনার বিকাশে তিনি গবেষণা চালাচ্ছেন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তার তত্বাবধানে ২০০১ সালে গড়ে উঠেছে ‘থিয়েটার থেরাপি সেন্টার অব দ্যা ডিজঅ্যাবল্ড’। এ সেন্টারের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মনোবল পুনরুদ্ধার করে এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে গড়ে তুলে তাদের জনশক্তিতে পরিণত করা হয়। তিনি ‘চিটাগাং সোসাইটি ফর দ্যা ডিজঅ্যাবল্ড’ এর বর্তমান সভাপতি এবং ‘বাংলাদেশ মেন্টাল হেলথ অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েশন’ এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব।
বাংলাদেশে মনোবিশ্লেষক নাট্যক্রিয়া ধারনার প্রবক্তা এবং এ ধারার চর্চা ও অনুশীলনের পথিকৃৎ ব্যক্তি মোস্তফা কামাল যাত্রা এই নাট্যবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিকিকরণের লক্ষ্যে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ থেরাপিউটিক থিয়েটার ইনস্টিটিউট’। তিনি থেরাপিউটিক থিয়েটার বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কনফারেন্সে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি একজন মনোবিশ্লেষক নাট্য বিজ্ঞানী হিসেবে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিফাইন, থাইল্যান্ড, আফগানিস্থান, নেপাল ও ভারতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরে বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা এবং থিয়েটার-বিষয়ক জার্নালে নাট্য ও উন্নয়ন বিষয়ক লেখালেখি তার নিয়মিত কাজের অংশ। প্রকাশিত হয়েছে নাট্য সংক্রান্ত (প্রথম খন্ড) এবং চট্টল নাট্য (প্রথম খন্ড) নামে দুটি গ্রন্থ। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে ‘বহুমাত্রিক নাট্যসৃজক জিয়া হায়দার’ এবং ‘মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাময়ী নাট্য’ নামের দুটি গ্রন্থ।
মোস্তফা কামাল যাত্রা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) থেকে চারুকলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) এবং এমএ (নাট্যকলা) সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি চবির নাট্যকলা বিভাগের অতিথি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত ২১ জুলাই প্রথম বারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের কার্য নির্বাহী কমিটির নির্বাচনে মোস্তফা কামাল যাত্রা কার্যকরী সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার সরব ও সাহসী পদচারণা লক্ষণীয়। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নাট্য প্রদর্শন, নাট্যকর্মী সংগ্রহ ও গড়ে তোলার লক্ষ্যে নাট্য সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ড পরিচালনা, নানা কারণে বিমুখ হয়ে পড়া গ্রামীণ-শহুরে মানুষকে পুনরায় নাট্য সংশ্লিষ্টতায় আনায় তার নানামুখী প্রয়াস সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের মধ্যে আশা জাগায় যে, একটি কার্যকর সুস্থ ও মননশীল সংস্কৃতির বিকাশ ত্বরান্বিত করার মধ্য দিয়ে চলমান সকল অসুস্থ ও বিকারগ্রস্থ ধারাকে হটিয়ে দেয়া সম্ভব; যা মঞ্চ নাটকের নিবেদিত প্রাণ মোস্তফা কামাল যাত্রা করে যাচ্ছেন।
তার নির্দেশিত শতাধিক নাটক মঞ্চ আলোকিত করেছে হাজার বার। অভিনয়, আলোক পরিকল্পনা, মঞ্চ পরিকল্পনায়ও রয়েছে তার সহজাত প্রবৃত্তি। তিনি নাট্য বিষয়ক পত্রিকা মঞ্চসন্ত, নাট্য সাময়িকী এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘মানসিকা’- এর অন্যতম সম্পাদক।
মোস্তফা কামাল যাত্রা দীর্ঘ নাট্য চর্চার অভিজ্ঞতায় এবং তৃণমূল জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী সমাজের সাথে নিবিড় সংশ্লিষ্টতায় তাদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে ‘শান্তির জন্য থিয়েটার’ অভীপ্সায় একাগ্রচিত্রে কাজ করে যাচ্ছেন।
নাট্য বিজ্ঞানকে মানবিকীকরণ, গণতান্ত্রিকায়ন, মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে প্রশান্তি সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থে ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠায় থিয়েটারের বহুমাত্রিক ব্যবহারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা- মোস্তফা কামাল যাত্রা ভবিষ্যৎ নাট্য অভিপ্সা।


এ বিভাগের আরো খবর...
নাট্যাধারের ‘৩২ ধানমন্ডি এবং….’এর ৩য় প্রদর্শনী সম্পন্ন নাট্যাধারের ‘৩২ ধানমন্ডি এবং….’এর ৩য় প্রদর্শনী সম্পন্ন
স্মৃতি সত্তায় ভাঙ্গা-গড়ার নাট্যোৎবে শনিবার ‘৩২ ধানমন্ডির এবং….’এর প্রদর্শনী স্মৃতি সত্তায় ভাঙ্গা-গড়ার নাট্যোৎবে শনিবার ‘৩২ ধানমন্ডির এবং….’এর প্রদর্শনী
দীর্ঘ ২২ বছর পর  ঢাকায় অঞ্জু ঘোষ দীর্ঘ ২২ বছর পর ঢাকায় অঞ্জু ঘোষ
ফিল্ম ডট এইচ শর্টফিল্ম নিয়ে যাত্রা ফিল্ম ডট এইচ শর্টফিল্ম নিয়ে যাত্রা
বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকান্ড নিয়ে মঞ্চনাটক ‘৩২ ধানমন্ডি এবং’র ২য় প্রদর্শনী সম্পন বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকান্ড নিয়ে মঞ্চনাটক ‘৩২ ধানমন্ডি এবং’র ২য় প্রদর্শনী সম্পন
আজ সুরের মানুষ হাসান জাহাঙ্গীর এর শুভ জন্মদিন আজ সুরের মানুষ হাসান জাহাঙ্গীর এর শুভ জন্মদিন
অামি তোমার গল্প হবো” অামি তোমার গল্প হবো”
যে যাই করি না কেন সবাইকে কোরআনের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে: মিশা যে যাই করি না কেন সবাইকে কোরআনের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে: মিশা
আমি বললাম প্রডিউসার কি শুতে চায়? আমি বললাম প্রডিউসার কি শুতে চায়?

মঞ্চ নাটকের নিবেদিত প্রাণ মোস্তফা কামাল যাত্রা
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)