‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জনতার বঙ্গবন্ধু’

---

ইকবাল ইবনে মালেক

ইতিহাস নিজস্ব গতিতে চলে কেউ এর চলমান পথ রুদ্ধ করতে পারেনা। ইতিহাসের পাতায় কিংবদন্তের ইতিহাস সব সময় জীবন্ত। এজন্য ইতিহাস মানব সমাজে সর্বদা শিক্ষার হাতছানি দিয়ে সব পেশার সব শ্রেণীর মানুষকে আহ্ববান জানাই। যে এর থেকে শিক্ষা নেয় সে জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারে আর যে শিক্ষা না নিয়ে বিপরীতস্রোতে চলে সে জীবনে ব্যথতা বরণ করে। ইতিহাসের উপর পড়তে গিয়ে সংগঠিত যুগ-যুগান্তরের বীরত্বগাঁথা যুদ্ধ-বিগ্রহ, সংগ্রাম, আন্দোলন ও আলোচিত ঘটনাবলি বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে হয়েছে। পড়তে হয়েছে ইতিহাসে পাতায় অসংখ্য বিখ্যাত বরণ্য ব্যক্তিদের জীবন সম্পর্কে। এ সমর বিজেতা ব্যক্তিদের জীবন আমাকে গভীরভাবে আন্দোলিত এবং আলোড়িত করে। গুণীজনদের জীবন সম্পর্কে জানা এবং কিছু লেখা আমার আদিম অনরুদ্ধ বাসনা। সে-সুবাদে মাটির মানুষ সংগ্রামি নেতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা আমার বহু দিনের হৃদয়ের প্রয়াস।


অবিসাংবাদিত নেতা জনতার বন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (মার্চ ১৭, ১৯২০-আগষ্ট ১৫, ১৯৭৫)। রাজনীতির মাঠে তাকে নানা্ন চড়াই-উৎরাই পারি দিতে হয়েছে। রাজনীতির অঙ্গনে রাজনীতির একজন নেতাকে যা-যা করতে হয়-আলোচনা, আন্দোলন, সমঝোতা, সংগ্রাম, জেল-জুলুম অত্যাচার, লড়াই তার সব কিছুই তিনি করেছেন। রাজনীতির মাঠে সুদিনে যেমনি হাসি উজ্জ্বলচিত্তে শক্ত ছিলেন ঠিক তেমনি দুর্দিনে স্পাতের ন্যায় অবিচল ছিলেন। স্বয়ং সততা, দক্ষতা ও যোগ্যতার বলে দলের একজন সাধারণ কর্মী থেকে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আসনে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এবং ভালবাসা দিয়ে জয় করে ছিলেন গণ মানুষের হৃদয়। তিনিই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি সাহসের সাথে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে স্বপ্ন দেখালেন স্বাধীনতার এবং নির্বিঘ্নে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্বপ্নের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা নামক বীজ বপন করে দিলেন। তাই তিনিই আজ বাঙালি হৃদয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম রূপকার।
যুগ-যুগ ধরে বাংলার সমৃদ্ধ জনপদে বহু রণ বীরের আগমন ঘটেছে।সমর বিজেতারা যুদ্ধ-সংগ্রামে বিজয় লাভ করে তারা দীর্ঘদিন ধরে বীরত্বের সাথে শাসন করেছিল বাংলার এ অঞ্চলকে। তারিই ধারাবাহিকতায় মধ্য যুগের শাসক শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮) বাংলার আকাশে স্বাধীন সুলতান হিসেবে সোনার বাংলার মসনদে আরোহন করে ছিলেন। কিন্তু প্রকৃ্ত অর্থে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ বাঙালি ছিলেন না। তিনি সিজিস্তানের অধিবাসী ছিলেন। সেদিক থেকে বিচার বিশ্লেষণে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাঙালি যিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম নৃপতি।
ভিনদেশীদের নানান অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, শোষণের হিংস্র হাত ও নোংরা ভয়ানক থাবা থেকে অশহায় বাঙালি জন্য মুক্ত ভূমির স্বপ্ন আর প্রয়াস ছিল বহু বাঙা্লি নেতারই এবং বাঙালিকে মনে প্রাণে নিঃস্বার্থভাবে জীবন দিয়ে ভালবেসে ছিলেন অনেক জননেতাই। তাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সভাষ বসু, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ সহ প্রমূখের অতুলনীয় অবদান বাঙালি সমাজে চির স্মরনীয়। এ বর্ষীয়ান বরণ্য ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা আর সম্মান রেখে বাঙালি তাদেরকে নাম ধরে ডাকে না। তাদেরকে দেশ বন্ধু, নেতাজী, শেরে বাংলা, মজলুম নামে ডাকে। তবে নির্ধিদায় বলা যায়, ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব সবার খেতাব কে ছাড়িয়ে গেছেন এবং বিশ্বের দরবারে অলংকিতভাবে ছড়িয়ে আছে তাঁর এ খ্যাতি। অকপটে অকুন্ঠিতচিত্তে বলতে হয়, বিশ্ব বিখ্যাত ব্যক্তিতের শ্রেষ্ঠ ভাষণ গুলোর মধ্যে স্বর্ণাক্ষরে জায়গা করে নেয় ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে কালজয়ী বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণ। এ ভাষণকে আখ্যায়িত করা হয় ‘বজ্রকন্ঠ’ নামে। এ কন্ঠ প্রবল তীব্রভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সমগ্র দুনিয়ার মুক্তিকামি মানুষকেও। অপরিসীম দক্ষতা দেখিয়ে বিশ্বের বড়ো বড়ো খ্যাতিনামা জননেতাকেও ছাড়িয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু।

কারহ খেয়াল খুশি মতো কারহ অবদান ইতিহাসের পাতা থেকে উচ্ছেদ এবং ইচ্ছে মতো কারহ বানোয়াট অবদান ইতিহাসের পাতায় সংযোজন বিয়োজন করা সহজতর বিষয় নয়। বাঙালির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ওতোপ্রোতভাবে নীবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। কেউ ইচ্ছে করলেই তাঁকে ইতিহাস থেকে নির্বাসিত করতে পারবে না। মহাত্মা গান্ধীকে বাদ দিয়ে যেমন ভারতের ইতিহাস লেখা যায় না, মাও সেতুংকে বাদ দিয়ে চীনের, হো চি মিনকে বাদ দিয়ে ভিয়েতনামের ইতিহাস লেখা যায় না, জর্জ ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস লেখা যায় না, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যায় না।
বিবিসি’র বাংলা সার্ভিসের জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই জরিপের ফলে ব্যাপকভাবে আন্দোলিত হয়েছেন। শিক্ষিত মননশীল সমাজ ভালোভাবেই জানতেন যে বঙ্গবন্ধুর স্থান বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাসে নির্ধারিত হয়ে আছে। তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্র এনে দিয়েছেন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাঙালির আবাসভূমি বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বিবিসি’র জরিপটি বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা’। এই বিষয়টি সর্বোচ্চ বিবেচনায় রেখে জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ অভিমত প্রদান করেছেন। বাঙালি জাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করার স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছেন। সুতরাং বঙ্গদেশের (বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার) সমগ্র বাঙালির মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে স্বীকৃত হয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত কাব্য, অন্যান্য সাহিত্য কিংবা প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও গবেষণা হয়েছে, দুনিয়ার আর কোনো জননেতা সম্পর্কে হয়তো এত রচনা এখনো রচিত হয় নি।বিবিসির জরিপ প্রকাশের পর বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দেশের ভেতরে এবং বাইরে অবস্থানরত সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, কবি, সাংবাদিক বিবিসি’র জরিপের ফলকে স্বাগত জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন লেখনীর মাধ্যমে।


বাঙালি রক্তের শিরা উপশিরায় মিশে আছে ভাবপ্রবণতা, ভাববিহবলতা ও আত্মবিস্মৃতির প্রবৃত্তি। বাঙালি চরিত্রে এসব ক্ষুদ্র ও বৃহৎ দোষ কিংবা গুণের সাথে শুধু পরিচিত ছিলেন না বরং তিনি এসব প্রবণতাকে পাকাপোক্ত ভাবে শনাক্ত করেছেন। তিনি তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন-
আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো ‘আমরা মুসলমান আর একটা হলো আমরা বাঙালি’। পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না ‘পরশ্রীকাতরতা’। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয় তাকে ‘পরশ্রীকাতরতা’ বলে। ঈর্ষা, বিদ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যে কিছু কিছু আছে। কিন্তু বাঙালি মধ্যে রয়েছে ‘পরশ্রীকাতরতা’। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা স্বত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।
সকল কিছুর উর্ধ্বে তিনি বাঙালিকে ভালবেসে ছিলেন হৃদয় দিয়ে এবং বাংলার মানুষ ছিল তাঁর ভালবাসার শক্তি। বিবিসির সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট একবার ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতকার গ্রহণকালে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার সব চেয়ে বড় শক্তি কী। হোয়াট ইজ ইউর স্ট্রেন্থ? বঙ্গবন্ধু জবাব দিয়ে ছিলেন ‘মাই পিপল। আমার জনগণ।তার পরের প্রশ্ন, হোয়াট ইজ ইউর উইকনেস? আপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী? ‘উত্তর দিয়েছিলেন, আমার জনগণের জন্য ভালবাসা। মাই লাভ ফর মাই পিপল’।
বঙ্গবন্ধু উদারচিত্তে হৃদয় দিয়ে ভালবেসার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন এই মাটি আর মানুষকে। এই ভূখন্ডের মানুষের স্বাধীনতার জন্য স্বাধীনতার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতার আন্দোলনের বৃহত্তর যাত্রাপথের নেতৃ্ত্ব দিয়েছেন তিনিই। আর মানুষের কেমন হৃদয়ের ভালবাসা পেয়েছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন ‘সাংবাদিক এবিএম মূসা তার ‘মুজিব ভাই’ নামের গ্রন্থে
ফেনীর মরহুম রুহুল আমিনকে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ভুসির ব্যবসা করত বলে তার নামই দিয়েছিলেন তিনি ‘ভুসি’। আমি তখন সংসদ সদস্য। এলাকায় গেলেই আমার কাছে ভ্যানভ্যান করত, ‘আমার কিছু হলো না, দেশ ও দলের জন্য এত কিছু করেছি, সর্বস্বান্ত হয়েছি। মুজিব ভাই প্রধানমন্ত্রী হলেন অথচ আমি কিছুই পেলাম না।’ এত সব ঘ্যানর ঘ্যানর শুনে বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘চলো, তোমাকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যাই। যা বলার তাকেই বলো।’
ঢাকায় এলো ভুসি, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে নিয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধু তাকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘ওরে আমার ভুসি আসছে’ বলে হইচই করে উঠলেন। ভুসি মাখনের মতো একেবারে গলে গেল। বঙ্গবন্ধু যতই বলেন, ‘কেমন আছিস, কোনো অসুবিধা নেই তো’, ভুসি ততই খালি তোতলায় আর বলে, ‘ভা-ভা ভালোই আছি। ক-ক কোনো অসুবিধা নেই।’ বঙ্গবন্ধু তার পরিবার, এলাকার, দেশের অবস্থার খোঁজখবর নিলেন, আধা ঘণ্টা পরে ভুসিকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। রেগে বললাম, ‘কী হলো, এত প্যানপ্যানানি গেল কই, কিছুই তো বললে না, চাইতে পারলে না!’ ভুসি আমতা আমতা করে বলল, ‘কী করব, নেতাকে দেখে যে সবই ভুলে গেলাম।


বঙ্গবন্ধুর চরিত্র ছিল বন্ধুভাবাপন্নতা বিস্ময়কর। ভিন্নমতাবলম্বী আমরা যে ভাবে হিংস্রা পরায়ণ হয়ে নির্মূল করতে উদ্যত হই। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়, বঙ্গবন্ধু খোদ ছিলেন তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির বিপরীত ধারায় অবস্থান করতেন আজীবন তার বন্ধু ডা. এম এ করিম ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বন্ধুবাৎসল্যের একটা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন ডা. এম এ করিম তার ‘ঢাকা সেন্ট্রাল জেল। নানা রঙের দিনগুলো’ বইয়ে!-

একদিন তাজউদ্দীন এসে বলল, শেখ মুজিব তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছে। দুদিন আমি বলেছি তোমাকে পাইনি, এবার যদি একথা বলি আর বিশ্বাস করবে না। এই টেলিফোন নাম্বার রেখে গেলাম পারলে যোগাযোগ করো। তাজউদ্দীন যখন এতো করে বলেছে তখন শেখকে টেলিফোন না করে আর পারলাম না। টেলিফোন করতেই শেখের টিপ্পনি কাটা কথা। কিরে, বিপদে পড়েছিস বুঝি। বললাম বিপদে না পড়লে কি আর তোমাকে ফোন করেছি। বললেন, কোথায় আছিস? বললাম, আমার স্থায়ী ঠিকানা কিশোর মেডিকেলে। শেখ বললেন, এখনই চলে আয়। বললাম কোথায়? বললেন সেক্রেটারিয়েটের পাশে ওখানে এলেই বুঝবি। সেক্রেটারিয়েটের কাছে যেতেই দেখি সহাস্যে দাঁড়িয়ে আছে গাজী গোলাম মোস্তফা। একসাথে জেলে থেকেছি। বলল, ওস্তাদ, আপনারে নেবার জন্য বড় ওস্তাদ আমাকে পাঠিয়েছে। বললাম, চলো। সেক্রেটারিয়েটে ঢুকতে এক পুলিশ অফিসার আমার ব্যাগ চেক করতে চাইলে গাজী বলল, ব্যাটা আমার চাকরি খেতে চাস? চিনিস কে? আমার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিজে হাঁটতে শুরু করল। গাজীর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে পুলিশ অফিসার আমাদের সাথে এলো। তখন গাজী গোলাম মোস্তফাও বড় এক হোমরা-চোমরা নেতা, রেডক্রসের চেয়ারম্যান।
মুজিব সেক্রেটারিদের নিয়ে মিটিং করছিলেন। আমার আসার কথা শুনে সেক্রেটারিদের বললেন আধা ঘণ্টার জন্য বিরতি, চা খান, আমার এক পুরনো বন্ধু এসেছে ওর সাথে দেখা করে আসি। বহুদিন পরে শেখ মুজিবের সাথে দেখা। তিনি তখন জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী কত কী। কিন্তু শেখ মুজিব তেমনি আছেন। বললেন, কিরে তুই যে একবারও দেখা করতে এলি না ব্যাপার কী বলত? বললাম, আমার প্রয়োজন থাকলে তো আসব। জিজ্ঞেস করল কেমন আছি। বললাম, ভালো। তারও কুশল জিজ্ঞেস করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কিসের মিটিং চলছিল? বললেন, যারা শহীদ হয়েছে প্রত্যেককে দু’হাজার টাকা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের মিটিং। কত টাকা লাগবে জিজ্ঞেস করলে সেক্রেটারি বলল, আট কোটি টাকা। কিন্তু ইতোমধ্যে ৩০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। আরও ৩০ কোটি টাকা লাগবে। এখন যেখানে একজন মারা গেছে সেখানে নাকি বলছে পাঁচজন মারা গেছে। এখন এসব টাকা এমনিভাবে সব হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক কিছুই আলাপ হলো শেষে আমি বললাম, সামনে তো ইলেকশন অন্তত ভালো পঞ্চাশজন বিরোধীদলীয় সদস্যদের সংসদে আসতে দিও, ভালো হবে। শেখ তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন কিসের ভালো হবে বলতো? তুই কি আমার থেকে বাংলাদেশ বেশি চিনিস? আমি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েছি, আমি সবগুলোকে চিনি। ওরা আমার কাছ থেকে গোপনে এসে টাকা নিয়ে যায়। টাকাও দেব, সিটও দেব তা কোনোদিন হয়? হয় সিট, নয় টাকা। আমি বললাম, তুমি যেটা ভালো বুঝবে করবে। আমার বলার ছিল বললাম।
আর একদিন মুজিবের বাসায় গেলাম। সেদিন মুজিবই খবর পাঠিয়েছিলেন। বেগম মুজিব আমাকে দেখে খুবই খুশি। আমার ছেলে কুমারকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। বেগম মুজিব বললেন, ভাই এতদিনে এলেন? তিনি নিজের হাতে চা বিস্কুট নিয়ে এসে আমাকে খাওয়ালেন। আমি আগেও বলেছি, আজ আবার বলছি দেশের রাজনীতিতে বেগম মুজিবের অবদান অনেক। নিজের সংসার সামলে মুজিবের বন্ধু-বান্ধব এবং পার্টির লোকদের আপ্যায়ন করেছেন। তার সাথে যারা মিশেছেন কেউই তার কথা ভুলতে পারবে না। বেগম মুজিব আমাকে ভাই বলে ডাকতেন। শ্রদ্ধাও করতেন। ঐদিন বেগম মুজিব আমাকে বললেন, ভাই আপনার ভাইয়ের সাথে হাত মিলিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে মিলে যান। আপনার গাড়ি রেখে, বড় গাড়িতে ফ্লাগ উড়িয়ে বাড়িতে যান। আমি জোড় হাত করে বললাম, বোন এ অনুরোধ আমাকে করবেন না। তিনি আর কথা বাড়াননি। পরে মুজিব এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ভাই কী বলে গেল? কী বলবে, উনি রাজি নন। মুজিব বলেছিলেন, আমি ওকে চিনি ও কোনোদিনই রাজি হবে না। আমি তোমাকে আগেই বলেছি। মুজিব আমার ছোট্ট ছেলে কুমারকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন, সারা দেশের মানুষ আমাকে নেতা মানল শুধু তোর বাবাই মানল না।

বঙ্গবন্ধু সব সময় জনগণের সুখ-দুঃখ নিয়ে চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। সর্বদা জনগণের কথা ভেবে বেশ সময় ধরে দূরে থাকতে পারতেন না। এ রকম একটা ঘটনার কথা বর্ণনা করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার ‘বিপুলা পৃথিবী’ বইয়ে-
১৯৭৪ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর কাছে আমরা শিক্ষা কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করতে গেলাম। সভাকক্ষে এসে আসন গ্রহণ করে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সভার পরে আমি যেন তার সঙ্গে দেখা করে যাই।… আমি যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, তখন সেখানে শিক্ষামন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।…
…আমি সেই অবকাশে জানতে চাইলাম, তিনি কেমন আছেন। কিছুকাল আগে তিনি মস্কোতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার দেশে প্রত্যাবর্তনের পরে আমার সঙ্গে এই প্রথম দেখা। আমার প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বললেন, তিনি খুব ভালো নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে মস্কো থেকে চলে এলেন কেন? তিনি বললেন, ‘আমি এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যাকে ভাইস চ্যান্সেলর ঘেরাও হলে তাকে উদ্ধার করতে যেতে হয়। মস্কোতে থাকতে খবর পেলাম, সূর্যসেন হলে সাতজন ছাত্র খুন হয়েছে। তখন চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে চলে এলাম।’ বললাম, ‘আপনি বিশ্রাম নিন না কেন? এখানে না পারেন, সপ্তাহান্তে ঢাকার বাইরে কোথাও চলে যান।’ তিনি বললেন, ‘দেশে কোথাও গিয়ে বিশ্রাম হবে না। যেখানে যাবো, সেখানেই লোকজন ভিড় করবে।’ বললাম, ‘লোকজনকে দেখা দেবেন না।’ এবার তার চোখে পানি এসে গেল। বললেন, ‘লোককে খেতে দিতে পারি না, পরতে দিতে পারি না, দেখাও যদি না দিতে পারি, তাহলে আমার আর থাকলো কী?’ আমি এবারে অপ্রস্তুত হলাম।
বঙ্গবন্ধু অশান্তি পছন্দ করতে না সব সময় শান্তি কামনা করতেন। সবার সাথে চাইতেন বন্ধুত্ব গড়তে। এ জন্য তিনি তাঁর পররাষ্ট্র নীতিতে ঘোষণা করেছেন- কারহ সাথে শত্রুতা নয় সবার সাথে বন্ধুত্ব চাই। এতেই একজন নিরহঙ্কার নেতার চিত্র ফুটে ওঠে। আজীবনই অসহায় আর দরিদ্রদের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন।সর্বোপুরি মানবতার বন্ধু ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
তথ্যসূত্র-অনলাইন

লেখক-সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।


এ বিভাগের আরো খবর...
আমরা কি অকৃতজ্ঞ জাতি!? আমরা কি অকৃতজ্ঞ জাতি!?
প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাকে ডাকতেন ‘মি. নো ম্যান’ আবদুল্লাহ আল নোমান প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাকে ডাকতেন ‘মি. নো ম্যান’ আবদুল্লাহ আল নোমান
নেপোলিয়ন সম্পর্কে অজানা কাহিনী নেপোলিয়ন সম্পর্কে অজানা কাহিনী
গরিব মানুষের চুরি হওয়া টাকা ফেরত চাই গরিব মানুষের চুরি হওয়া টাকা ফেরত চাই
বাংলার ষোলআনা  ‘গরিবের রক্তচোষা কারা’ বাংলার ষোলআনা ‘গরিবের রক্তচোষা কারা’
এক জ্ঞানসাধকের তীর্থে এক জ্ঞানসাধকের তীর্থে

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জনতার বঙ্গবন্ধু’
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)